একটি শহরের পরিচয় যখন দুই ভিন্ন দিকে টানে, তখন সেই শহরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয়ে ওঠে সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক ও পরিবেশগত প্রশ্ন। খুলনা ঠিক এমনই এক দ্বৈত পরিচয়ের শহর, একদিকে যাকে বলা হয় দেশের শিল্পনগরী, অন্যদিকে যার দক্ষিণে বিছিয়ে আছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এই দুই পরিচয় একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত না হলে দ্রুতই তারা পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হতে পারে।
শিল্পায়নের গতি এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, চাহিদা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে খুলনা বিভাগে নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ছে, ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এই প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হতে যাচ্ছে সাম্প্রতিক এক অবকাঠামো পরিকল্পনার মাধ্যমে, যেখানে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রস্তাবিত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে খুলনাঞ্চলের যোগাযোগ নেটওয়ার্কে গুণগত পরিবর্তন আসবে, যার ফলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, পণ্য পরিবহন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সংখ্যার হিসাবেও এই পরিবর্তন বিশাল, কারণ সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক শুমারিতে দেখা গেছে, খুলনা বিভাগে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চৌদ্দ লাখ নব্বই হাজারের কাছাকাছি।
কিন্তু এই একই ভূগোলে, একই সময়ে, উল্টো দিকের একটি গল্পও লেখা হচ্ছে। পরিবেশবিদদের এক পর্যবেক্ষণে উঠে আসে ভয়াবহ এক পরিসংখ্যান, গত এক দশকে সুন্দরবনে দূষণ বেড়েছে সাত গুণ, যার পেছনে শিল্প কারখানা স্থাপন, যান্ত্রিক নৌযান চলাচল ও বিষ দিয়ে মাছ শিকারসহ বিভিন্ন তৎপরতা বনের গাছপালা, বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রাণীর ওপর প্রভাব ফেলছে। একজন বিশেষজ্ঞ আরও নির্দিষ্ট করে বলেছেন, সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদনদীর পানি ও মাটিতে দূষণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় আগের মতো আর গাছের চারা গজাচ্ছে না। এই একটি বাক্যই আসলে গোটা সংকটের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সারাংশ, একটি বন যেখানে নিজের সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই দূষণ কেবল দূরবর্তী শিল্প কারখানা থেকে আসছে না, এটি জন্ম নিচ্ছে খোদ পর্যটন খাতের ভেতর থেকেও, যাকে আমরা প্রায়ই সংরক্ষণের বন্ধু বলে ভাবি। সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় বনের গাছ কেটে, খাল ভরাট করে খুলনায় এ পর্যন্ত পঁয়ত্রিশটি রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে এসি ও জেনারেটর চালানো হচ্ছে এবং সারাক্ষণ বাজছে সাউন্ড সিস্টেম, যার ফলে উচ্চ শব্দের কারণে পশুপাখিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে আর ব্যবসাকেন্দ্রের বর্জ্য সুন্দরবনের খালে গিয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের নামে হওয়া প্রতিটি কর্মকাণ্ডই টেকসই নয়, এমনকি তা যদি পর্যটনের মতো আপাত সবুজ খাতেও হয়।
তবে এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমাধানের বীজ, আর সেটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই বিদ্যমান। পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয় স্পষ্ট করে জানায়, তাদের দায়িত্ব দ্বিমুখী, একদিকে তারা পরিবেশবান্ধব প্রকল্প, কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সমস্যা হলো নীতি আর বাস্তবায়নের মধ্যে ফারাক, যেমনটি আগেই সুন্দরবন ইকোট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যানের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল। কাগজে থাকা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো আর মাঠে থাকা পঁয়ত্রিশটি অবৈধ রিসোর্টের মধ্যে যে ব্যবধান, সেটিই আসলে খুলনার প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।

এই দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসার পথ একটি অভিন্ন ধারণায় নিহিত, যাকে বলা যায় ভৌগোলিক শৃঙ্খলাবদ্ধ উন্নয়ন। খুলনা শহর ও তার শিল্পাঞ্চলকে যদি স্পষ্টভাবে সুন্দরবনের সীমানা থেকে একটি সুরক্ষিত দূরত্বে পরিকল্পিতভাবে বিন্যস্ত করা যায়, দূষণকারী শিল্প কারখানাগুলোর জন্য কঠোর বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করা যায়, আর একই সঙ্গে সুন্দরবনঘেঁষা প্রতিটি পর্যটন স্থাপনার জন্য একটি স্বাধীন পরিবেশগত নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যায়, তবে শিল্প আর বন একই ভূগোলে সহাবস্থান করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ব্যবহৃত স্থায়ী নমুনা প্লট পদ্ধতি, যেখানে সুন্দরবনের তেত্রিশটি স্থানে গাছের চারা জন্মানো, চারা মারা যাওয়া ও গাছের বৃদ্ধির তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা হচ্ছে, এই ধরনের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেই আরও বিস্তৃত করে শিল্প এলাকার দূষণ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, যাতে একটি একীভূত পরিবেশগত সতর্কব্যবস্থা তৈরি হয়।
খুলনার প্রকৃত পরীক্ষা তাই কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নয়, এটি প্রশাসনিক প্রজ্ঞার পরীক্ষা। একটি শহর যখন একই সঙ্গে শিল্পের ধোঁয়া আর বনের নিঃশ্বাস দুটোই ধরে রাখতে চায়, তখন তাকে বেছে নিতে হয় সতর্ক, বৈজ্ঞানিক ও আইনি জবাবদিহিতাপূর্ণ এক মধ্যপথ। সুন্দরবন যদি ধ্বংস হয়, খুলনার শিল্প অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদে তার প্রাকৃতিক ভিত্তি হারাবে, কারণ এই বনই এই অঞ্চলের জলবায়ু, মৎস্য সম্পদ আর পর্যটনের প্রকৃত ভিত্তি। তাই খুলনার টেকসই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি সহজ কিন্তু কঠিন সত্য মেনে নেওয়ার ওপর, উন্নয়ন আর সংরক্ষণ প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একে অপরের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা।
লেখক : ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।
খুলনা গেজেট/এনএম


